প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের স্বার্থ রক্ষায় নিয়মিত কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ২১ জুন তিনি দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে এই সফর শেষে তিনি সরাসরি চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানে যাত্রা করবেন। চার দিনের চীন সফর শেষে ২৬ জুন তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।মালয়েশিয়া সফর: শ্রমবাজার ও আসিয়ান প্রেক্ষাপটমালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে ২২ জুন একান্ত বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নিচ্ছে।এই সফরকে গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি এবং শিক্ষা খাতের উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে। এছাড়া বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা হবে গুরুত্বের সঙ্গে। আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি এবং আরসিইপি-তে (RCEP) যোগদানের বিষয়ে মালয়েশিয়ার সমর্থন চাওয়া হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার আহ্বানও থাকবে এজেন্ডায়। সফরকালে সংস্কৃতি বিষয়ক সমঝোতা স্মারকসহ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) ভিত্তি হিসেবে টার্মস অব রেফারেন্স বিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে।চীন সফর: অর্থনৈতিক কূটনীতি ও বিনিয়োগের নতুন দিগন্তমালয়েশিয়া সফর শেষে ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী চীনের দালিয়ানে ‘সামার দাভোস’ খ্যাত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) অংশ নেবেন। এই সফরে তার মূল লক্ষ্য থাকবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা তুলে ধরা এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো।চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের আমন্ত্রণে দালিয়ানে তিনি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ১৩তম বার্ষিক সভায় অংশ নেবেন। সফরসূচি অনুযায়ী, ২৩ জুন বিকালে ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন তিনি। পাশাপাশি কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারপ্রধানদের সঙ্গে তার বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দুতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগবেইজিংয়ে অবস্থানকালে ২৫ জুন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) আয়োজনে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ চীনা ব্যবসায়ীদের সামনে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও সম্ভাবনা তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিনে চীনের গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা (অ্যাকশন প্ল্যান) ও একটি প্রটোকলসহ প্রায় ১৭টি দলিল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।সফরের শেষ দিন ২৬ জুন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নানা ইস্যুর পাশাপাশি কৌশলগত অংশীদারত্বের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। তিয়েনআনমেন স্কয়ারে বীর যোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে ২৬ জুন বিকালে তার বেইজিং ত্যাগের কথা রয়েছে।পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, প্রধানমন্ত্রীর এই দুই দেশ সফর বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে।
বগুড়ার শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলায় প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নামে গঠিত বিতর্কিত তিন ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনায় নবগঠিত ‘মীরবাড়ী’, ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ ইউনিয়নের নাম বাতিলের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই খবরে স্থানীয় জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ ও অস্বস্তি কেটে স্বস্তি ফিরে এসেছে।শনিবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি সরকারি চিঠি জেলা প্রশাসকের দপ্তরে পৌঁছায়। বিষয়টি নিশ্চিত করে বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান জানান, শুক্রবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি ফোন করে তাকে নাম পরিবর্তনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন।প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ করে এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক পরিচিতিকে গুরুত্ব দিয়ে যেন ইউনিয়নগুলোর জন্য নতুন নাম প্রস্তাব করা হয়। এ লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনকে দ্রুত গণশুনানি আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর যথাযথ প্রক্রিয়ায় তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।সম্প্রতি শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলা পুনর্গঠনের সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলে ও পৈতৃক বাড়ির নামে এই ইউনিয়নগুলোর নামকরণ করা হয়েছিল। এছাড়া প্রতিমন্ত্রীর এক আত্মীয়ের নামে ‘স্বর্ণগ্রাম’ নামেও একটি ইউনিয়ন গঠন করা হয়। এসব নামকরণের খবর জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। এমনকি বিষয়টি জাতীয় সংসদ পর্যন্ত গড়িয়েছিল।তবে সরকারি নতুন এই নির্দেশনায় ‘স্বর্ণগ্রাম’ ইউনিয়নটির বিষয়ে স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে। সাধারণ মানুষের দাবি, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠানের নামকরণ না করে এলাকার গৌরবময় ইতিহাসের প্রতিফলন ঘটে—এমন নামই রাখা হোক।এদিকে, নিজের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণের বিতর্কের রেশ না কাটতেই প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নিজেই এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। গত ১ জুন তিনি শিক্ষা সচিবের কাছে ডিও লেটার পাঠিয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো অবস্থাতেই তার বা তার পরিবারের কারো নামে যেন কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ না করা হয়।প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, তার অগোচরে বা অতি উৎসাহী মহলের স্বার্থসিদ্ধির কারণে এমন বিতর্কিত নামকরণের অপচেষ্টা করা হয়েছিল। শনিবার বিকেলে প্রতিমন্ত্রী জানান, ইউনিয়নগুলোর নাম পরিবর্তনের সরকারি সিদ্ধান্তের পর তিনি বিষয়টি নিয়ে আর কোনো বিতর্ক বা সমালোচনা চান না। প্রশাসনের এমন পদক্ষেপে এলাকার মানুষ এখন ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক গুরুত্বের ভিত্তিতে ইউনিয়নগুলোর নতুন নামকরণের অপেক্ষায় আছেন।
বগুড়ার শিবগঞ্জের ৫৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়’। এই নাম বদলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নামে প্রতিষ্ঠানটির নতুন নামকরণের আবেদন ঘিরে এলাকায় চলছে জোর বিতর্ক। একদিকে বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ, অন্যদিকে সেই উদ্যোগ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রে।জানা গেছে, সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিদ্যালয়টির অ্যাডহক কমিটি নাম পরিবর্তনের এই প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড ও বগুড়ার জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেয়।তবে নিজের নামে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি মোটেও ভালোভাবে নেননি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। বিষয়টি জানার পর ১ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে তিনি একটি আধা সরকারি (ডিও) পত্র পাঠান। সেই পত্রে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, তার অগোচরে বা স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় অনেকে তার নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব পাঠাচ্ছেন, যা তার কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত। তিনি ঐতিহ্যবাহী কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের চেয়ে তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখাকেই অধিকতর সমীচীন বলে মনে করেন।প্রতিমন্ত্রী তার পত্রে আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, অতীতে নিজের উদ্যোগে বা পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার বাইরে নিজের বা পরিবারের সদস্যদের নামে নতুন কোনো নামকরণের প্রস্তাব গ্রহণ না করার জন্য তিনি মন্ত্রণালয়ের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি অন্তত ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।অন্যদিকে, নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবটি স্থানীয় পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন সভাপতি ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান জানান, স্থানীয় মরহুম রফিক উদ্দিন প্রামাণিক ও মরহুম মুছা চৌধুরীর মতো শিক্ষানুরাগীদের দান করা জমিতে গড়ে ওঠা এই স্কুলের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অতীতে অনেক সভাপতি আসলেও এমন নাম পরিবর্তনের চেষ্টা কেউ কখনো করেননি।বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক তাজুল ইসলাম জানান, ৯২৪ জন শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে প্রতিমন্ত্রীর অবদান অনস্বীকার্য। তার প্রচেষ্টায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে এবং বর্তমানে স্কুলটি জাতীয়করণের প্রক্রিয়া চলছে। শিক্ষকদের দাবি, শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিমন্ত্রীর বিশেষ ভূমিকার কারণে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় এই নামকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।প্রধান শিক্ষক আরও দাবি করেছেন, প্রতিমন্ত্রীর আপত্তির কথা জানতে পেরে ১১ জুন মন্ত্রণালয়কে আরেকটি চিঠি দিয়ে এই প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে সেই চিঠির কোনো অনুলিপি এখনো জনসম্মুখে আসেনি।ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন হওয়া উচিত, নাকি দীর্ঘদিনের নাম ও সুনাম অটুট রাখা বাঞ্ছনীয়—এখন সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে।বগুড়ার শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য নাম পরিবর্তন না করে অন্য কোনোভাবে প্রতিমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিকল্প কোনো উপায় কি থাকতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় যখন বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের কালো মেঘ জমেছিল, ঠিক তখনই কিছুটা স্বস্তির খবর নিয়ে এলো সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক। ইরানের সঙ্গে করা সমঝোতা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, শান্তি আলোচনার প্রথম পর্বে অংশ নিতে দেশটিতে পৌঁছেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। দীর্ঘ উত্তেজনার পর দুই দেশের প্রতিনিধিদের এই মুখোমুখি বসার ঘটনাকে কূটনৈতিক মহলে বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।এর আগে আলোচনার টেবিলে বসার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের। কিন্তু শেষ মুহূর্তে হুট করেই তার সফর স্থগিত করা হয়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক অভিযান এবং নৃশংসতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ায় ভ্যান্স এই আলোচনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। গত কয়েকদিন ধরে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৭ জনের মৃত্যুসহ ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও ইসরায়েলি বাহিনীর তৎপরতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, যা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভঙ্গুর সমঝোতা চুক্তিকে ভেস্তে দেওয়ার উপক্রম করেছিল।তবে পরিস্থিতির মোড় ঘোরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপে। এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, তিনি ইসরায়েলকে স্পষ্টভাবে বার্তা দিয়েছেন—মাঝেমধ্যে মাথা ঠান্ডা রেখে শান্ত হওয়া জরুরি। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতির পথ প্রশস্ত হয়। লেবাননের স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেল চারটা থেকে কার্যকর হওয়া এই যুদ্ধবিরতিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রাথমিক বাধা দূর হওয়ার বড় সূচক হিসেবে ধরা হচ্ছে।উল্লেখ্য, বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেন। সেই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব ফ্রন্টে সামরিক সংঘাত বন্ধ করা। লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর বেপরোয়া আচরণ সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় শান্তি আলোচনার পথ অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, সুইজারল্যান্ডে স্টিভ উইটকফ মূলত ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক ইস্যুতে চূড়ান্ত সমঝোতার ভিত্তি স্থাপনে কাজ শুরু করেছেন। যদিও ইসরায়েলের কট্টরপন্থি অংশটি এই শান্তি প্রক্রিয়া নস্যাৎ করতে তৎপর ছিল, তবুও বর্তমান যুদ্ধবিরতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের আলোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘদিনের এই বৈরিতা কাটিয়ে দুই পক্ষ টেকসই কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে কি না।
তিস্তা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মেটাতে নতুন আরেকটি ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, তিস্তায় পানি সংরক্ষণের জন্য আরও একটি ব্যারেজ নির্মাণের কারিগরি ও আর্থিক বিষয়গুলো বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।প্রধানমন্ত্রী জানান, তিস্তা নদীকেন্দ্রিক একটি বড় মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় ১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং, ১১০ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ, ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং ১৭০ বর্গ কিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের কাজ করার প্রস্তাব রয়েছে।স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। পাবনা মানসিক হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক মানের একটি পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে রূপান্তরের কাজ চলছে। তিনি জানান, দেশের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রায় ৬ হাজার ৩৫৯টি পদ খালি রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব শূন্যপদ পূরণে সরকার কাজ করছে। হামের প্রাদুর্ভাব রোধে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সরকারের লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, ঢাকার ওপর চাপ কমাতে রিং রোড, রেডিয়াল নেটওয়ার্ক এবং যানজট নিরসনে বিভিন্ন ইন্টারসেকশনে প্রয়োজনীয় স্ট্রাকচার তৈরি করা হবে। তিনি আরও বলেন, ঢাকা-আশুলিয়া ও ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেলপথে যাতায়াত নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করতে প্রধান রুটগুলোতে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে সব বিভাগীয় শহরে ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে ভূ-উপরিস্থ বা নদী-জলাধারের পানির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প চলমান রয়েছে।হজযাত্রীদের জন্য সুখবর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী বছরগুলোতে হজের খরচ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। ২০২৬ সালে হজের খরচ কমানোর ইতিবাচক প্রভাব হজযাত্রীরা পেয়েছেন। ২০২৭ সালের প্যাকেজ মূল্য যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের জন্য সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। এছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের মাধ্যমে বৈদেশিক কর্মসংস্থানকে আরও গতিশীল করার ওপরও জোর দেন সরকারপ্রধান।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর চার মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূলধারায় ফিরে আসার বিষয়টি এখন আলোচনার টেবিলে উঠে এসেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং রাজনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এসব আলোচনার বড় অংশই নিছক গুঞ্জন বা এক ধরনের রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের প্রতিফলন। বর্তমান বাংলাদেশে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাতে শেখ হাসিনার ফিরে আসার সম্ভাবনা তাত্ত্বিকভাবে যতটা আলোচিত, প্রায়োগিকভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও অনিশ্চিত।ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ক্ষমতার দম্ভে থাকা স্বৈরশাসক বা দীর্ঘমেয়াদী শাসকরা যখন ক্ষমতাচ্যুত হন, তখন তাদের প্রত্যাবর্তনের পথ সাধারণত কণ্টকাকীর্ণ থাকে। ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস বা থাইল্যান্ডের থাকসিন সিনাওয়াত্রার দিকে তাকালে আমরা একধরনের তুলনামূলক চিত্র পাই। থাকসিন সিনাওয়াত্রা দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরেছিলেন, কিন্তু তার জন্য দীর্ঘ আইনি লড়াই ও সমঝোতার এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। অন্যদিকে, গণ-অভ্যুত্থানে চূর্ণ হওয়া শাসনের পর শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেনি, বরং গত দেড় দশকের শাসনব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভেতরে এক গভীর ক্ষোভ ও বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। ফলে এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক রদবদল নয়, বরং একটি নতুন রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা।আমাদের দেশের আজকের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে শেখ হাসিনার ফিরে আসার গুঞ্জনটি মূলত প্রচারণার অংশ বলে মনে করছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক। সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মতে, অপরাধ ও দুর্নীতির দায়মুক্তির কোনো সুযোগ এখানে নেই। তার ভাষ্যমতে, গণতন্ত্রের নামে কোনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি এদেশের মানুষ আর চায় না। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে, আর বর্তমান সময়ে সেই ইতিহাস জনমতের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, আওয়ামী লীগের ভেতরে যে আত্মসমালোচনার অভাব, তা তাদের জনগণের থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। দলটি যদি তাদের অতীতের ভুলগুলো স্বীকার করে নতুনভাবে সামনে আসতে পারত, তবে হয়তো ভিন্ন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জনগণ সেই পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখছে না।বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র চার মাস। এই সময়ের মধ্যে সরকার সব আশা পূরণ করতে না পারলেও, হাসিনাবিরোধী জনমত ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলো এখনো অটুট আছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার ফেরা মানেই হলো দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া। তিনি ফিরলে তাকে আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে যেতেই হবে। এখানে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে জবাবদিহিতার বিষয়টিই মুখ্য। সুতরাং, যারা ভাবছেন যে রাজনীতির স্বাভাবিক ধারায় তিনি বা তার দল খুব সহজেই ফিরে আসবে, তারা হয়তো দেশের বর্তমান গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনকে পুরোপুরি অনুধাবন করছেন না।তবে এর অর্থ এই নয় যে, আওয়ামী লীগ চিরতরে রাজনীতির মাঠ থেকে মুছে যাবে। একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের সাংগঠনিক শক্তি ও তৃণমূলের অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ যেমনটি মনে করেন, কোনো দল নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা থাকলেই রাজনীতি থেকে হারিয়ে যায় না, তবে তাদের ফেরার পথটি কঠিন হতে হবে তাদের নিজের অতীতের কাজের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে। জনগণ কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা এখন আর দেখছে না, বরং তারা দেখছে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার এক কঠিন লড়াই।আমরা যদি এই পরিস্থিতির একটি টেকসই সমাধান খুঁজতে চাই, তবে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে আইনের শাসন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এই সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রয়োজন। আওয়ামী লীগসহ যেকোনো বড় দলকে ফিরতে হলে অবশ্যই নতুন ও স্বচ্ছ নেতৃত্বের উত্থান ঘটাতে হবে, যারা অতীতের ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিশীলিত রাজনীতি চর্চা করবে। তৃতীয়ত, বর্তমান সরকারকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রোধে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই সন্ধিক্ষণে অস্থিরতা সৃষ্টির যেকোনো অপচেষ্টা মোকাবিলায় কূটনৈতিক ও আইনি সক্ষমতা বাড়াতে হবে।পরিশেষে একটি কথাই বলা প্রয়োজন, রাজনীতির মাঠ কখনো খালি থাকে না। কিন্তু সেই মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা যদি কেবল প্রোপাগান্ডা বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কৌশল হয়, তবে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। দেশের মানুষ এখন জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে এই স্বপ্ন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য জনগণের অবিচল সংকল্প। ইতিহাসের এই বাঁকবদলে ব্যক্তি বা দলের চেয়ে রাষ্ট্রের সুরক্ষা এবং জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই হবে আগামীর মূল চালিকাশক্তি।
একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা তার জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রধান ভিত্তি। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক মহলে এবং জনমনে চীনের সাথে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক চুক্তির যে আলোচনা গুরুত্ব পেয়েছে, তা রাষ্ট্রের কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধিরই ইঙ্গিতবহ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে কেন্দ্র করে কেবল সামরিক সরঞ্জামের আধুনিকায়ন নয়, বরং বৃহত্তর ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দেশই এককভাবে কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে টিকে থাকতে পারে না; বরং বহুমুখী সম্পর্ক ও কৌশলগত স্বনির্ভরতাই একটি জাতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানজনক স্থান করে দেয়।বাংলাদেশের বিমানবাহিনী ও প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়ন সময়ের দাবি। আধুনিক যুদ্ধবিমানের মতো স্পর্শকাতর প্রতিরক্ষা সামগ্রী সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি ও সক্ষমতা যাচাই করা একান্ত জরুরি। চীন সফরকালে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বা জে-১০ সিই-এর মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের আলোচনা যদি চূড়ান্ত হয়, তবে তা বাংলাদেশের আকাশ সীমার সুরক্ষায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে গণ্য হবে। তবে প্রতিরক্ষা কেনাকাটার ক্ষেত্রে আমাদের কেবল সাময়িক সামরিক শক্তির দিকে তাকালে চলবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং নিজস্ব জনশক্তির সক্ষমতা তৈরির দিকেও মনোনিবেশ করতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে প্রতিটি দেশের নিজস্ব কৌশলী অবস্থান থাকে এবং বাংলাদেশ সেই বাজারে নিজের জায়গা তৈরি করার সময় নিজেদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েই দর কষাকষি করবে—এমনটাই প্রত্যাশা।তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বড় ধরনের অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভারত ও চীন—উভয় দেশের সাথেই বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পর্কগুলো হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তিতে। কোনো রাষ্ট্রের প্রতি দাসত্ব বা অন্ধ আনুগত্য যেমন কাঙ্ক্ষিত নয়, তেমনি কোনো রাষ্ট্রের সাথে শত্রুতা তৈরি করাও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। বাংলাদেশ যদি তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে চায়, তবে তা হওয়া উচিত নিজের সুরক্ষার জন্য, অন্য কাউকে উত্তেজিত করার জন্য নয়। কূটনৈতিক পরিপক্বতা সেখানেই, যেখানে রাষ্ট্র তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বজায় রেখে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা যেকোনো সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পূর্বশর্ত। যখন একটি রাষ্ট্র বড় কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির পথে এগোয়, তখন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উস্কানিমূলক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়া বা জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টা হওয়াটা রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে মন্দিরের সুরক্ষা বা ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নিয়ে যেসব উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে, তা দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষার এই ক্রান্তিলগ্নে সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষের উচিত রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাখা। ষড়যন্ত্র বা উস্কানির কাছে মাথানত না করে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর যদি সত্যিই বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় কোনো মাইলফলক হয়ে ওঠে, তবে তা হবে দেশের জন্য ইতিবাচক। তবে এই সফলতা কেবল চুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না, এর মাধ্যমে অর্জিত প্রযুক্তি ও কৌশল দেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কতটা শক্তিশালী করল, তা-ই হবে আসল মাপকাঠি। ভারতের সাথে সম্পর্কের সমীকরণেও বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্বের জায়গাটি অটুট রাখবে—এটাই জনগণের আকাঙ্ক্ষা। ভারত, চীন বা অন্য যেকোনো বিশ্বশক্তির সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে নিজস্ব উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়াই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও বাস্তবসম্মত পথ। জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির স্বার্থে এখন আমাদের কূটনৈতিক বিচক্ষণতা ও ধৈর্যের পরিচয় দেওয়ার সময়।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে যে বিশাল মূর্তিগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলোকে ওপর থেকে দেখলে মনে হতে পারে নিতান্তই ধর্মীয় শিল্পকর্ম। কিন্তু আপনি যদি সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ মাথায় রেখে চোখ একটু বড় করে তাকান, তবে দেখবেন গ্রামের এই সাধারণ ভূমিকে ঘিরে যেন কোনো পুরোনো মানচিত্র আবার নতুন করে আঁকা হচ্ছে। এঙ্গি মুর্তি কেবল ইট-পাথর বা সিমেন্টের কাঠামো নয় বরং এটা একটা টোপ। আমাদের এই বর্ডার বেল্ট বা সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় যখন কোনো পক্ষ হঠাৎ করেই এমন বিশাল স্থাপনা তৈরি করে, তখন ভূ-রাজনীতির ব্যাকরণ বলে দেয়—এর পেছনে কেবল ভক্তি নেই, আছে অন্য কোনো হিসাব।এই গল্পটা শুরু হয়েছিল একজন এসি মেকানিককে কেন্দ্র করে। নাম তার হরিদাস চন্দ্র তরণী। সিনেমার গল্পের মতো তার উত্থান। এক সময় গণভবনের অন্দরে তার অবাধ যাতায়াত ছিল। কেন? কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যারা থাকেন, তাদের আশেপাশে এমন কিছু মানুষ প্রয়োজন হয় যারা সবসময় ‘কাজের’ কথা শোনে না, কিন্তু ‘কাজ’ হাসিল করে দেয়।হরিদাস এক সময় অনেকের কর্ম হাসিলের মাধ্যম হয়ে উঠেন। হরিদাস যখন গণভবনে যাতায়াত করতেন, তখন তিনি হয়তো জানতেন না যে ভবিষ্যতে এই অভিজ্ঞতা তাকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। শেখ সেলিমের মতো নেতাদের সাথে তার লেনদেন আর বিরোধের খবর যখন সামনে আসে, তখন বোঝা যায়, তিনি কতটা অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ছিলেন এমন এক সুতো, যা দিয়ে ক্ষমতার বড় বড় লবিং কাজ করতো।এখন প্রশ্ন হলো, একজন এসি মেকানিক কেন গাইবান্ধার মতো একটা জায়গায় ১৭ কোটি টাকা খরচ করে মূর্তি বানাচ্ছেন? ভূ-রাজনীতির ভাষায় এটাকে বলে ‘সফট পাওয়ার’ বা নরম শক্তি প্রয়োগ। আপনি যখন কোনো জায়গায় বিশাল কোনো চিহ্ন স্থাপন করেন, তখন সেটা ওই এলাকার ভৌগোলিক স্বকীয়তাকে বদলে দেয়। এটাকে বলা হয় ‘টেরিটোরিয়াল মার্কিং’। প্রতিবেশী দেশ ভারত যখন সীমান্তে নানামুখী চাপ তৈরি করে, যখন খবর আসে সীমান্তে পুশ-ইনের—তখন এমন একটি জায়গা তৈরি করা কি নিছক কাকতালীয়? মনে হচ্ছে, এটি একটি ‘ট্রোজান হর্স’ কৌশলের প্রথম ধাপ। ভেতর থেকে জায়গাটা দখল করে ফেলা, যাতে ভবিষ্যতে ওই এলাকাকে কেন্দ্র করে অন্য কোনো অশুভ ছায়া খেলা চালাতে পারে।গোয়েন্দা মহলে গুঞ্জন আছে, হরিদাসের সাথে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। তিন ভাই ভারতে থাকে, নিয়মিত বৈঠক হয়—এগুলো কি কেবল পারিবারিক সম্পর্ক? একজন মেকানিক কেন সবজি ব্যবসায় পাঁচ কোটি টাকা আয় দেখাবেন? আসলে এগুলো হলো মানি লন্ডারিংয়ের পুরনো কায়দা। টাকা আসছে বিদেশ থেকে, গন্তব্য গাইবান্ধা। তারা এমন এক দুর্গ বানাচ্ছে যার চারপাশ সিসি ক্যামেরায় ঘেরা। কেন? একটা উপাসনালয়ে এত কড়া পাহারা কেন থাকে? এর মানে হলো, ভেতরে যা ঘটছে, তা বাইরের পৃথিবীর মানুষের দেখার অধিকার নেই। এখানে কেবল উপাসনা হয় না, এখানে হয়তো তৈরি হচ্ছে নতুন কোনো ‘অপারেশন থিয়েটার’।আরেকটা বিষয় খেয়াল করবেন, পলাশবাড়ীর এই মূর্তিগুলো ঠিক এমন জায়গায় বসানো হয়েছে যা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সাথে খুব কাছাকাছি। মানে, এখান থেকে পুরো অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নজর রাখা খুব সহজ। যারা সীমান্তে অস্থিরতা তৈরি করতে চায়, তারা সবসময় এমন কিছু স্পট খোঁজে যা থেকে সহজে পালানো যায় আবার সহজে নিয়ন্ত্রণও নেওয়া যায়। পুশ-ইনের মাধ্যমে যখন মানুষ পাঠানো হচ্ছে, তখন এই মূর্তিগুলো কি সেই মানুষের জন্য ল্যান্ডমার্ক বা দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করছে? অথবা এগুলো কি এমন কোনো নেটওয়ার্কের অংশ যা আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি?আমরা যখন এসব কথা বলি, অনেকে বলেন আমরা বেশি ষড়যন্ত্র খুঁজি। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের অনেক দেশে এমন ছোটখাটো ‘সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ বা ‘মন্দির’ আড়ালে আসলে ফরওয়ার্ড অপারেটিং বেস বা গোয়েন্দা ঘাঁটি হিসেবে কাজ করেছে। ভারত যদি সত্যি বাংলাদেশের বন্ধু হয়, তবে তারা কেন একটি ছোট দেশের ভেতরে এভাবে ধর্মীয় উস্কানির আড়ালে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়? এই মূর্তিগুলো কি শান্তির প্রতীক, নাকি আগ্রাসনের নতুন কোনো সংস্করণ?দিনশেষে বড় প্রশ্নটা হলো—হরিদাস একা এটা করছেন না। তার পেছনে আছে এক বিশাল নেটওয়ার্ক। সেই নেটওয়ার্কের সুতো কি আমাদের সীমান্তের ওপারের ক্ষমতার শিরা -উপশিরাতে গিয়ে মিশেছে? যদি তাই হয়, তবে আমাদের সাবধান হওয়ার সময় এসেছে। কারণ বন্ধুত্বের নামে যখন কেউ আমাদের আঙিনায় দুর্গ বানায়, তখন সেই দুর্গ একদিন আমাদেরই বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। আর হরিদাসরা তখন হয়তো আর থাকবে না, রেখে যাবে এক জটিল রাজনৈতিক সংকট, যার দাম দেবে সাধারণ মানুষ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যবই বা ভূগোলের মানচিত্র—যেখান থেকেই দেখা হোক না কেন, সার্বভৌমত্বের একটি নির্দিষ্ট সীমানা থাকে। কিন্তু সম্প্রতি তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহিদের একটি বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, তিনি বোধহয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এমন এক নতুন সংজ্ঞায় পৌঁছেছেন, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে। বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে নাগরিকদের পুশইন বা ঠেলে পাঠানোর ঘটনাকে তিনি দিব্যি বলে দিলেন ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’। একজন দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন একটি বক্তব্য কীভাবে দেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে এখন জনমনে নানা প্রশ্ন উঠছে।সহজ কথায় বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যাক। পুশইন মানে হলো অন্য রাষ্ট্র থেকে জোর করে মানুষ বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া। এখন যে ব্যক্তিটি সীমান্ত পেরিয়ে এপারে আসছেন, তিনি তো আর জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক নন, কিংবা ভোটার তালিকার কোনো নামও নন। তিনি আসছেন অন্য দেশ থেকে, ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অন্য দেশ থেকে। তাহলে এটি কীভাবে সংশ্লিষ্ট দেশের ‘অভ্যন্তরীণ’ বিষয় হয়?রাষ্ট্রের সীমান্ত কোনো খোলা ডাস্টবিন নয় যে, প্রতিবেশী চাইলেই সেখানে যা ইচ্ছা পাঠিয়ে দেবে। এটি একটি সার্বভৌম ভূখণ্ড। ড. জাহিদ সাহেবকে যদি আমরা একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝাই—ধরুন, আপনার ড্রয়িংরুমে কোনো প্রতিবেশী এসে অনধিকার প্রবেশ করে কোনো কিছু রেখে গেল। আপনি কি তাকে বলতে পারবেন এটা আপনার ‘অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা অভিযান’? নিশ্চয়ই না। এটা বরং একটি অনধিকার চর্চা, যা রাষ্ট্রের মানচিত্র ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।তথ্য উপদেষ্টা দেশের এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, যার কাছ থেকে জনগণ সঠিক তথ্য ও স্পষ্ট অবস্থানের আশা করে। ‘পুশইন’ শব্দটি কেবল একটি শব্দ নয়, এটি হাজারো মানুষের ভাগ্য, দেশের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি জটিল সমীকরণ। এ নিয়ে যখন কোনো সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তি এমন অদ্ভুত যুক্তি দেন, তখন সেটি জনগণের কাছে কেবল রসিকতা হিসেবেই ধরা দেয় না, বরং রাষ্ট্রের অসহায়ত্বকেও ফুটিয়ে তোলে।রাষ্ট্রের কোনো নীতিনির্ধারণী পদে বসে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া মানে হলো নিজের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করা। একজন তথ্য উপদেষ্টার কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকে স্বচ্ছ ও দূরদর্শী ভাষ্য। পুশইনের মতো একটি জাতীয় ও নিরাপত্তা ইস্যুকে ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা সরকারগুলোর মৌলিক দায়িত্ব। এ জায়গায় নমনীয়তা বা ভুল ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই।আমরা আশা করি, তথ্য উপদেষ্টা মহোদয় তার বক্তব্যের দায়বদ্ধতা বুঝবেন এবং আগামীতে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অবস্থান ও মর্যাদার কথা মাথায় রাখবেন। কারণ, রাষ্ট্রের তথ্য আর জনগণের তথ্যের মধ্যে যে বড় একটি ফারাক থাকে, তা যেন কোনোভাবেই দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের চোরাবালিতে হারিয়ে না যায়। রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষায় ও কূটনীতিতে কৌশলী ও স্পষ্টবাদী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নজিরবিহীন ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। আগামী ২৩ জুনের কর্মসূচিকে ঘিরে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ঢাকাজুড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মহানগরের কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ ২০০টিরও বেশি পয়েন্টে বিশেষ পিকেট, তল্লাশি চৌকি (চেকপোস্ট) এবং গোয়েন্দা নজরদারির নিশ্ছিদ্র বলয় তৈরি করা হয়েছে।রবিবার (২১ জুন) ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী স্বাক্ষরিত এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই নিটোল নিরাপত্তা পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।ডিএমপি জানায়, নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নানা কর্মসূচির আড়ালে যাতে কেউ কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে না পারে, সেজন্যই এই বহুমাত্রিক আগাম ব্যবস্থা। রাজধানীর ২০০টিরও বেশি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক চেকপোস্ট ও পিকেট ডিউটি কাজ করবে। বিশেষ করে ঢাকার সবকটি প্রবেশপথে জোরদার করা হচ্ছে কড়া তল্লাশি ব্যবস্থা, যাতে বাইরে থেকে এসে কেউ মহানগরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ না পায়।মাঠপর্যায়ের এই নিরাপত্তা নিশ্চিতে সাধারণ পুলিশের পাশাপাশি মাঠে নামানো হচ্ছে ডিএমপির সবকটি বিশেষায়িত উইং। এর মধ্যে ডিবি (গোয়েন্দা শাখা), সিটিটিসি (কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম), এসবি (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) এবং আইএডি (ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন) সমন্বিতভাবে পুরো ঢাকার ওপর কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি চালাবে।যেকোনো আকস্মিক বা জরুরি পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে মোকাবিলা করার জন্য রাজধানীর স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। এছাড়া ডিএমপির প্রধান চারটি কন্ট্রোল রুমে পর্যাপ্ত পরিমাণে ‘রিজার্ভ ফোর্স’ স্ট্যান্ডবাই বা প্রস্তুত রাখা থাকবে, যাতে প্রয়োজন হওয়ামাত্রই দ্রুত অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা যায়। ডিএমপি কমিশনারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেরা মাঠে থেকে এই বিশাল নিরাপত্তা কর্মযজ্ঞ তদারকি করবেন।এদিকে, এই নিরাপত্তা বিজ্ঞপ্তির পাশাপাশি চলতি জুন মাসে রাজধানীতে পরিচালিত বিশেষ অভিযানের একটি খতিয়ানও তুলে ধরেছে ডিএমপি। সরকারি তথ্যমতে, ১ থেকে ২০ জুনের মধ্যে মহানগরের বিভিন্ন থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে রাজনৈতিক মামলায় ৮২ জন এবং ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতির সময় হাতেনাতে ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।রাজনৈতিক মামলার পাশাপাশি সাধারণ অপরাধ দমনেও পুলিশের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। এই ২০ দিনে চুরির ঘটনায় ১২১ জন, দস্যুতার অভিযোগে ১১৩ জন এবং ডাকাতি মামলায় ১২০ জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া ডিএমপির থানা ও সিটিটিসির চিরুনি অভিযানে এই মাসে এ পর্যন্ত ৫৫ জন চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে চারজন পুলিশের তালিকাভুক্ত দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজ।ডিএমপির পক্ষ থেকে নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে, রাজধানীর শান্তি, স্থায়িত্ব ও জননিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখতে পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যেকোনো মূল্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর চার মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূলধারায় ফিরে আসার বিষয়টি এখন আলোচনার টেবিলে উঠে এসেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং রাজনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এসব আলোচনার বড় অংশই নিছক গুঞ্জন বা এক ধরনের রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের প্রতিফলন। বর্তমান বাংলাদেশে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাতে শেখ হাসিনার ফিরে আসার সম্ভাবনা তাত্ত্বিকভাবে যতটা আলোচিত, প্রায়োগিকভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও অনিশ্চিত।ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ক্ষমতার দম্ভে থাকা স্বৈরশাসক বা দীর্ঘমেয়াদী শাসকরা যখন ক্ষমতাচ্যুত হন, তখন তাদের প্রত্যাবর্তনের পথ সাধারণত কণ্টকাকীর্ণ থাকে। ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস বা থাইল্যান্ডের থাকসিন সিনাওয়াত্রার দিকে তাকালে আমরা একধরনের তুলনামূলক চিত্র পাই। থাকসিন সিনাওয়াত্রা দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরেছিলেন, কিন্তু তার জন্য দীর্ঘ আইনি লড়াই ও সমঝোতার এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। অন্যদিকে, গণ-অভ্যুত্থানে চূর্ণ হওয়া শাসনের পর শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেনি, বরং গত দেড় দশকের শাসনব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভেতরে এক গভীর ক্ষোভ ও বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। ফলে এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক রদবদল নয়, বরং একটি নতুন রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা।আমাদের দেশের আজকের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে শেখ হাসিনার ফিরে আসার গুঞ্জনটি মূলত প্রচারণার অংশ বলে মনে করছেন অধিকাংশ বিশ্লেষক। সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মতে, অপরাধ ও দুর্নীতির দায়মুক্তির কোনো সুযোগ এখানে নেই। তার ভাষ্যমতে, গণতন্ত্রের নামে কোনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি এদেশের মানুষ আর চায় না। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে, আর বর্তমান সময়ে সেই ইতিহাস জনমতের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, আওয়ামী লীগের ভেতরে যে আত্মসমালোচনার অভাব, তা তাদের জনগণের থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। দলটি যদি তাদের অতীতের ভুলগুলো স্বীকার করে নতুনভাবে সামনে আসতে পারত, তবে হয়তো ভিন্ন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জনগণ সেই পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখছে না।বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র চার মাস। এই সময়ের মধ্যে সরকার সব আশা পূরণ করতে না পারলেও, হাসিনাবিরোধী জনমত ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলো এখনো অটুট আছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার ফেরা মানেই হলো দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া। তিনি ফিরলে তাকে আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে যেতেই হবে। এখানে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে জবাবদিহিতার বিষয়টিই মুখ্য। সুতরাং, যারা ভাবছেন যে রাজনীতির স্বাভাবিক ধারায় তিনি বা তার দল খুব সহজেই ফিরে আসবে, তারা হয়তো দেশের বর্তমান গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনকে পুরোপুরি অনুধাবন করছেন না।তবে এর অর্থ এই নয় যে, আওয়ামী লীগ চিরতরে রাজনীতির মাঠ থেকে মুছে যাবে। একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের সাংগঠনিক শক্তি ও তৃণমূলের অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ যেমনটি মনে করেন, কোনো দল নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা থাকলেই রাজনীতি থেকে হারিয়ে যায় না, তবে তাদের ফেরার পথটি কঠিন হতে হবে তাদের নিজের অতীতের কাজের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে। জনগণ কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা এখন আর দেখছে না, বরং তারা দেখছে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার এক কঠিন লড়াই।আমরা যদি এই পরিস্থিতির একটি টেকসই সমাধান খুঁজতে চাই, তবে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে আইনের শাসন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এই সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রয়োজন। আওয়ামী লীগসহ যেকোনো বড় দলকে ফিরতে হলে অবশ্যই নতুন ও স্বচ্ছ নেতৃত্বের উত্থান ঘটাতে হবে, যারা অতীতের ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিশীলিত রাজনীতি চর্চা করবে। তৃতীয়ত, বর্তমান সরকারকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রোধে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই সন্ধিক্ষণে অস্থিরতা সৃষ্টির যেকোনো অপচেষ্টা মোকাবিলায় কূটনৈতিক ও আইনি সক্ষমতা বাড়াতে হবে।পরিশেষে একটি কথাই বলা প্রয়োজন, রাজনীতির মাঠ কখনো খালি থাকে না। কিন্তু সেই মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা যদি কেবল প্রোপাগান্ডা বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কৌশল হয়, তবে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। দেশের মানুষ এখন জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে এই স্বপ্ন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য জনগণের অবিচল সংকল্প। ইতিহাসের এই বাঁকবদলে ব্যক্তি বা দলের চেয়ে রাষ্ট্রের সুরক্ষা এবং জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই হবে আগামীর মূল চালিকাশক্তি।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় নতুন করে আলোচনার টেবিলে উঠে এসেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অন্তর্বর্তী সমঝোতা চুক্তি। কিন্তু এই কূটনৈতিক সাফল্য এখন চরম হুমকির মুখে, যার নেপথ্যে রয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু এমন এক নেতা যার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, অথচ তার হাতে রয়েছে এক শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। এই সমীকরণই তাকে বর্তমান ভূ-রাজনীতির অন্যতম ‘স্পয়লার’ বা চুক্তি বিনষ্টকারী হিসেবে গড়ে তুলেছে।চুক্তির অনিশ্চয়তা ও নেতানিয়াহুর একগুঁয়েমিওয়াশিংটন ও তেহরান চুক্তিতে সই করলেও ইসরায়েল এই চুক্তির অংশ নয়। নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি এই শর্ত মানতে বাধ্য নন। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ঘোষণা করেছেন, লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় আইডিএফ কোনো সময়সীমা ছাড়াই অবস্থান করবে। এই অবস্থানের ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও এখন বড় পরীক্ষার মুখে।রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াই ও অভ্যন্তরীণ সমীকরণনেতানিয়াহুর এই কঠোর অবস্থানের পেছনে রয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক দুর্বলতা। ইরান যুদ্ধে প্রত্যাশিত সাফল্য না মেলায় এবং দুর্নীতির মামলার চাপে থাকা নেতানিয়াহু এখন চরমপন্থীদের সমর্থনের ওপর টিকে আছেন। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্ত মেনে নেওয়া তার জন্য ‘রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী’ হতে পারে, কারণ এতে ইসরায়েলি নিরাপত্তার জন্য দৃশ্যমান কোনো সাফল্য মিলছে না।ওয়াশিংটন-তেল আবিব সম্পর্কের বৈপরীত্যযুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অঢেল অস্ত্র ও কূটনৈতিক সুরক্ষা দিলেও, তেল আবিবকে শর্ত মানাতে ওয়াশিংটন হিমশিম খাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কাঠামো—বিশেষ করে প্রভাবশালী দাতা গোষ্ঠী ও লবিস্টদের কারণে নেতানিয়াহু এমন এক স্বাধীনতা ভোগ করছেন যা অন্য কোনো মিত্র রাষ্ট্রের জন্য প্রায় অসম্ভব।নেতানিয়াহুর কৌশল: ‘নিঃশব্দে’ চুক্তি নস্যাৎনেতানিয়াহুর একটি সুনিপুণ কৌশল রয়েছে। তিনি চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান না করেও লেবাননে সামরিক অভিযান চালিয়ে ইরানকে যুদ্ধের দিকে টেনে নিচ্ছেন। তেহরানের আলোচকরা স্পষ্ট করেছেন, লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার এই চুক্তির মূল চেতনার অংশ। এখন ইসরায়েলি হামলায় হিজবুল্লাহর ক্ষয়ক্ষতি বাড়লে এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলকে থামাতে ব্যর্থ হয়, তবে ইরান এই ভঙ্গুর চুক্তি থেকে সরে আসবে। অর্থাৎ, কোনো প্রকাশ্য ঘোষণা ছাড়াই কেবল সামরিক অভিযান চালিয়ে নেতানিয়াহু পুরো শান্তিচক্রটি ভেঙে দেওয়ার পথে হাঁটছেন।মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির সারমর্ম হলো, যে পক্ষ চুক্তিতে সই করেনি, তাদের নীরবতা বা অসহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কোনো শান্তিচুক্তিই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ট্রাম্প প্রশাসন যেখানে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে দ্রুত সংঘাত থামাতে চাইছে, সেখানে নেতানিয়াহু মনে করছেন সামরিক লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ থামানো ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। এই দুই ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গির দ্বন্দ্বে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি এখন এক চরম অনিশ্চিত ও ভঙ্গুর অবস্থায় উপনীত হয়েছে।এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শান্তি প্রক্রিয়া টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী কূটনৈতিক কৌশল কী হবে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা তার জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রধান ভিত্তি। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক মহলে এবং জনমনে চীনের সাথে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক চুক্তির যে আলোচনা গুরুত্ব পেয়েছে, তা রাষ্ট্রের কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধিরই ইঙ্গিতবহ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে কেন্দ্র করে কেবল সামরিক সরঞ্জামের আধুনিকায়ন নয়, বরং বৃহত্তর ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দেশই এককভাবে কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে টিকে থাকতে পারে না; বরং বহুমুখী সম্পর্ক ও কৌশলগত স্বনির্ভরতাই একটি জাতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানজনক স্থান করে দেয়।বাংলাদেশের বিমানবাহিনী ও প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়ন সময়ের দাবি। আধুনিক যুদ্ধবিমানের মতো স্পর্শকাতর প্রতিরক্ষা সামগ্রী সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি ও সক্ষমতা যাচাই করা একান্ত জরুরি। চীন সফরকালে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বা জে-১০ সিই-এর মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের আলোচনা যদি চূড়ান্ত হয়, তবে তা বাংলাদেশের আকাশ সীমার সুরক্ষায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে গণ্য হবে। তবে প্রতিরক্ষা কেনাকাটার ক্ষেত্রে আমাদের কেবল সাময়িক সামরিক শক্তির দিকে তাকালে চলবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং নিজস্ব জনশক্তির সক্ষমতা তৈরির দিকেও মনোনিবেশ করতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে প্রতিটি দেশের নিজস্ব কৌশলী অবস্থান থাকে এবং বাংলাদেশ সেই বাজারে নিজের জায়গা তৈরি করার সময় নিজেদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েই দর কষাকষি করবে—এমনটাই প্রত্যাশা।তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বড় ধরনের অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভারত ও চীন—উভয় দেশের সাথেই বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পর্কগুলো হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তিতে। কোনো রাষ্ট্রের প্রতি দাসত্ব বা অন্ধ আনুগত্য যেমন কাঙ্ক্ষিত নয়, তেমনি কোনো রাষ্ট্রের সাথে শত্রুতা তৈরি করাও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। বাংলাদেশ যদি তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে চায়, তবে তা হওয়া উচিত নিজের সুরক্ষার জন্য, অন্য কাউকে উত্তেজিত করার জন্য নয়। কূটনৈতিক পরিপক্বতা সেখানেই, যেখানে রাষ্ট্র তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বজায় রেখে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা যেকোনো সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পূর্বশর্ত। যখন একটি রাষ্ট্র বড় কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির পথে এগোয়, তখন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উস্কানিমূলক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়া বা জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টা হওয়াটা রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে মন্দিরের সুরক্ষা বা ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নিয়ে যেসব উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে, তা দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষার এই ক্রান্তিলগ্নে সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষের উচিত রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাখা। ষড়যন্ত্র বা উস্কানির কাছে মাথানত না করে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর যদি সত্যিই বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় কোনো মাইলফলক হয়ে ওঠে, তবে তা হবে দেশের জন্য ইতিবাচক। তবে এই সফলতা কেবল চুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না, এর মাধ্যমে অর্জিত প্রযুক্তি ও কৌশল দেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কতটা শক্তিশালী করল, তা-ই হবে আসল মাপকাঠি। ভারতের সাথে সম্পর্কের সমীকরণেও বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্বের জায়গাটি অটুট রাখবে—এটাই জনগণের আকাঙ্ক্ষা। ভারত, চীন বা অন্য যেকোনো বিশ্বশক্তির সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে নিজস্ব উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়াই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও বাস্তবসম্মত পথ। জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির স্বার্থে এখন আমাদের কূটনৈতিক বিচক্ষণতা ও ধৈর্যের পরিচয় দেওয়ার সময়।
রংপুরের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে এখন গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে। বিশেষ করে ভারতীয় হাইকমিশনারের ওই অঞ্চলে সফর এবং কৌশলগত স্থানে নতুন মন্দির নির্মাণকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে দানা বাঁধছে নানা প্রশ্ন। এই পরিস্থিতির মাঝেই নতুন করে সামনে আসছে কিছু বিতর্কিত মুখ, যারা ধর্মীয় ইস্যুকে পুঁজি করে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চায় কি না—তা নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে তীব্র ধোঁয়াশা।চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ঘটনাপ্রবাহের রেশ না কাটতেই এবার পূজা উদযাপন পরিষদের ব্যানারে মাঠে সক্রিয় হয়েছেন সন্তোষ শর্মা। এর আগে চৈতালী চক্রবর্তীর ‘সনাতনী’ পরিচয়ে রাজনীতির মাঠে আবির্ভূত হওয়া এবং তার ভূমিকা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, সন্তোষ শর্মার ক্ষেত্রেও তা যেন একই বৃত্তের পুনরাবৃত্তি। পূজা উদযাপন পরিষদের দাবি অনুযায়ী, সারা দেশে মন্দির ভাঙার হুমকির প্রতিবাদে তারা রাজপথে নেমেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন হলো—এই হুমকির প্রকৃত উৎস কোথায়? কোথায় বা কবে এমন হুমকি দেওয়া হয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা ভিত্তি সাধারণের জানা নেই। বরং রংপুরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় ভারতীয় অর্থায়নে মন্দির নির্মাণের বিষয়টিই এখন মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।রাজনৈতিক সমীকরণটিও এখন বেশ জটিল হয়ে উঠছে। সন্তোষ শর্মা যে সংবাদপত্রের সম্পাদক, সেই পত্রিকার প্রকাশক বিএনপির হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন অপু। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, এই অপতৎপরতার সঙ্গে দলের সম্পর্ক কী? এছাড়া সরকার দলীয় হুইপ এবং পত্রিকার প্রকাশক হিসেবেই বা তিনি তার সম্পাদকের বিতর্কিত ভূমিকার কী ব্যাখ্যা দেবেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিকে এখনই জনসমক্ষে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। নাম ও প্রভাব ব্যবহার করে কেউ যদি ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করে, তবে দল হিসেবে তাদের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলোতে একটি নির্দিষ্ট ‘প্যাটার্ন’ বা ছক স্পষ্ট। একদিকে ধর্মীয় অধিকার আদায়ের মোড়কে রাজপথে শক্তি প্রদর্শন, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও সম্প্রীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। সচেতন মহল মনে করছেন, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য যদি কেবল সাধারণের ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত করা হতো, তবে তা প্রশংসিত হতো। কিন্তু যদি এর পেছনে কোনো বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়ন কিংবা অস্থিতিশীলতা তৈরির দূরভিসন্ধি থাকে, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সাধারণ মানুষ এখন সতর্ক; তারা চায় না ধর্মের নামে দেশের মাটি কোনো ষড়যন্ত্রের খেলার মাঠ হয়ে উঠুক।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের মাটির প্রতিটি ধূলিকণায় ধর্মীয় সম্প্রীতির সুর মিশে আছে। রাজধানী ঢাকার গেন্ডারিয়ার স্বামীবাগের ৭৯ নম্বর ঠিকানায় শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দির বা ইসকন মন্দিরের ঠিক বিপরীতেই দাঁড়িয়ে আছে ৩৫০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক স্বামীবাগ জামে মসজিদ। এটি কেবল দুটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের সান্নিধ্য নয়, বরং বহু শতাব্দীর সামাজিক মেলবন্ধনের এক জীবন্ত দলিল। শুধু ঢাকা নয়, লালমনিরহাটের কালিবাড়ির পুরান বাজার জামে মসজিদ ও মন্দির, মৌলভীবাজারের জুড়ির ভূয়াই বাজার, টাঙ্গাইলের নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি কিংবা নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁয়ের ইউসুফগঞ্জ—এমন বহু দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে সারা দেশে। কোথাও একই আঙিনায়, কোথাও বা একই ফটক দিয়ে ভিন্ন ধর্মের মানুষ নিজ নিজ উপাসনালয়ে প্রবেশ করছেন। শত বছর ধরে এভাবেই এক ছায়াতলে চলছে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, যা বাংলাদেশের চিরায়ত সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।তবে ধর্মীয় সম্প্রীতির এই দীর্ঘ ইতিহাসের বিপরীতে বর্তমানে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি দৃশ্যমান। একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা মহলকে প্রায়ই বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু গোষ্ঠী কি বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় পিছিয়ে? পরিসংখ্যান বলছে উল্টো কথা।বর্তমানে দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য রাষ্ট্র যে পরিমাণ পৃষ্ঠপোষকতা করছে, তা নজিরবিহীন। দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে ৩২ হাজার মন্দিরে ৫ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে বছরে ১৪০ কোটি টাকার বেশি অর্থায়ন, আর ইমাম-মুয়াজ্জিনের পাশাপাশি পুরোহিত, ভিক্ষু, পাদ্রীদের মাসিক ভাতার ব্যবস্থা—এর সবই রাষ্ট্রীয় অসাম্প্রদায়িক কাঠামোর প্রমাণ। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বড়দিন, বুদ্ধ পূর্ণিমা, জন্মাষ্টমীর মতো বড় উৎসবে ছুটি এবং নিজ ধর্মের জন্য ঐচ্ছিক ছুটি ভোগ করার সুযোগ কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব। এমনকি উৎসব বোনাসের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র আজ সকল ধর্মের নাগরিককে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।এমন উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশে দাঁড়িয়েও যখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী 'অধিকারের' নামে রাজপথে নামে, তখন তাদের দাবি নিয়ে জনমনে সন্দেহের উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। বিশ্লেষকদের মতে, এদের এই আন্দোলন ধর্মীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ বেশি। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং উগ্রবাদকে পুঁজি করে বিদেশি শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই যেন তাদের মূল লক্ষ্য।সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এরা শান্তিপ্রিয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে চায়। ধর্মীয় অধিকারের কথা বলে আসলে তারা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এবং জাতীয় স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করতে তৎপর। নাগরিক অধিকার নিশ্চিত থাকলেও, যারা রাষ্ট্রের এই উদারতাকে অস্বীকার করে বিদেশনির্ভর রাজনীতিতে লিপ্ত, তারা প্রকারান্তরে দেশের সকল ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকেই হুমকির মুখে ফেলছে। দেশের শান্তিপ্রিয় নাগরিকরা মনে করেন, সম্প্রীতির এই চিরচেনা বাংলাদেশে উস্কানিমূলক রাজনীতির কোনো স্থান নেই। যেসব উগ্রবাদী ব্যক্তি বা সংগঠন ধর্মীয় সম্প্রীতির বিরুদ্ধে কথা বলার বা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টায় লিপ্ত তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। তারা কারো এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত কি না তা আইনিপদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে অঙ্কুরেই দমনের অভিমত সচেতন মহলের।
বহুল আলোচিত সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকা থেকে র্যাব কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব হত্যা মামলার আসামি আলী আকবরকে (২৬) গ্রেফতার করেছে র্যাব-৭। শুক্রবার রাতে সলিমপুর ইউনিয়নের ছিন্নমূল ১ নম্বর সমাজ এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। গ্রেফতার আলী আকবর একই এলাকার আলী আহমদের ছেলে।শনিবার বিকালে র্যাব-৭ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বাহিনীটির সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এ. আর. এম. মোজাফ্ফর হোসেন জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকায় অভিযান চালানো হয়। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের মামলায় গ্রেফতার আলী আকবরের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাকে সীতাকুণ্ড থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।উল্লেখ্য, গত ১৯ জানুয়ারি সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসীদের অতর্কিত ও নির্মম হামলায় র্যাব-৭ এর কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব নিহত হন। সেই ঘটনায় র্যাবের আরও চার সদস্যকে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছিল দুর্বৃত্তরা। ওই বর্বরোচিত ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকাটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির আওতায় রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে র্যাবের গোয়েন্দা কার্যক্রম ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।
পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার দেবোত্তর বাজারে মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায় শাহাদাৎ (৩০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকাল ১০টার দিকে বাজারের একটি ভবনের ছাদে পানি সরাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার মৃত্যু হয়। শাহাদাৎ ওই বাজারের ‘আকুল স্টোর’ নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ছিলেন।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের ছাদের ওপর বৃষ্টির পানি জমেছিল। সেই পানি নিচে অবস্থিত আকুল স্টোরের ওপর পড়ছিল, যা দোকানের মালামাল নষ্ট করছিল। বৃষ্টির পানি পড়া বন্ধ করতে শাহাদাৎ ওই ভবনের ছাদে ওঠেন। ছাদে ওঠার পর অসাবধানতাবশত পা পিছলে নিচে থাকা বৈদ্যুতিক তারের ওপর পড়ে যান তিনি। মুহূর্তের মধ্যেই বিদ্যুতের সংস্পর্শে এসে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।শাহাদাৎকে ছটফট করতে দেখে বাজারের ‘সিটি কাপড়’ দোকানের ব্যবসায়ী আক্তার তাকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে যান। এ সময় তিনিও বিদ্যুতায়িত হয়ে আহত হন। পরে স্থানীয়রা ফায়ার সার্ভিসে খবর দিলে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং শাহাদাতের মরদেহ উদ্ধার করে। আহত ব্যবসায়ী আক্তারকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিহত শাহাদাতের মরদেহ তার নিজ গ্রাম কদমডেঙাতে স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেন। শাহাদাতের অকাল মৃত্যুতে তার পরিবারে চলছে শোকের মাতম। কদমডেঙা গ্রামের বাড়িতে এখন স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে বাজারের ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।এদিকে ঘটনার পরপরই স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বাজার এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে ঝুলে থাকা বৈদ্যুতিক তার এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। তারা এ ধরনের প্রাণহানি এড়াতে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
পাবনায় সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় অভিযুক্ত ইউনিয়ন যুবদল নেতা আবুল কাশেম শেখকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার ভোরে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর এলাকা থেকে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে আটক করা হয়। একই সঙ্গে সংগঠনের শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে স্থানীয় ইউনিয়ন যুবদল। অভিযুক্ত কাশেম পাবনার আতাইকুলা থানার আড়িয়াডাংগী গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয় ইউনিয়ন যুবদলের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন।গত ১১ জুন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে এই ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পরদিন ১২ জুন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মা বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই এলাকা জুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে স্থানীয়রা বিক্ষুব্ধ হয়ে অভিযুক্তের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। বিষয়টি পুলিশের নজরে আসার পর থেকেই অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে আতাইকুলা থানা পুলিশ মাঠে নামে।আতাইকুলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবর রহমান জানান, অপরাধী গা ঢাকা দিলেও পুলিশের বিশেষ দল সারারাত অভিযান চালিয়ে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে তাকে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।অন্যদিকে, রোববার রাতে দলীয় এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ইউনিয়ন যুবদল থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, সংগঠনের সব পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তার সঙ্গে কোনো ধরনের সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে এই বহিষ্কারাদেশের বিষয়টি এখন স্থানীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
পটুয়াখালীর ছোটবিঘাই ইউনিয়নে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ৬০ বছর বয়সী ট্রলার চালক মো. দুলাল গাজীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত সোমবার (১৫ জুন) সকালে সদর উপজেলার মাটিভাংগা গ্রামে এই পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই স্থানীয়দের ক্ষোভ ও প্রশাসনের তৎপরতায় অভিযুক্তকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকাল আনুমানিক ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে মাটিভাংগা গ্রামের বাসিন্দা ও পেশায় ট্রলার চালক দুলাল গাজী শিশুটিকে একা পেয়ে ফুসলিয়ে ধর্ষণ করে। শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি ও কান্না দেখে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি আঁচ করতে পারেন। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো ছোটবিঘাই ইউনিয়নের মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও যুবসমাজ এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অবুঝ শিশুর ওপর এমন নির্যাতন কেবল আইনি অপরাধ নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চরম নিদর্শন।বিষয়টি জানার পরপরই পটুয়াখালী সদর থানা পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অভিযানে নামে। জনরোষের মুখে অভিযুক্ত লম্পট দুলাল গাজী পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশ দ্রুত তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।পটুয়াখালী সদর থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী শিশুটিকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি কঠোর মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং দ্রুত চার্জশিট প্রদানের মাধ্যমে অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। এলাকাবাসী এখন আইনের দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন।